কখনো কি খুব নীরবে পাতার শব্দ শুনেছেন? জলের ওপর বাতাসের মৃদু স্পর্শ? কিংবা একাকী দাঁড়িয়ে পাখির ডানার ক্ষীণ শব্দটুকু অনুভব করেছেন? কিছু কিছু সুর আছে, যা কেবল কানে পৌঁছায় না—সরাসরি গিয়ে আঘাত করে মানুষের ভেতরের কোনো অদৃশ্য দরজায়।
জাপানি নির্মাতা কন ইচিকাওয়ার ‘বার্মিজ হার্প’ তেমনই একটি সিনেমা। নামেই যার সুর লুকিয়ে আছে। ‘হার্প’-এর বাংলা প্রতিশব্দ বীণা ধরলে, ‘বার্মিজ হার্প’ হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘বার্মিজ বীণা’—যার সুর যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় মানবিকতার কাছে।
ছবিটি শুধু যুদ্ধের গল্প নয়। বরং যুদ্ধের পর একজন মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রশ্ন, অনুশোচনা এবং আত্মিক পরিবর্তনের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে বার্মায় অবস্থানরত একদল জাপানি সেনা পরাজয়ের পর আত্মসমর্পণ করে। তাদেরই একজন সৈনিক, মিজুসিমা, বিচ্ছিন্ন হয়ে আশ্রয় পান এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে।
সেখান থেকেই শুরু হয় তার অন্য এক যাত্রা।
যুদ্ধক্ষেত্রে এতদিন যে মানুষটি মৃত্যু, ধ্বংস আর সহিংসতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, সেই মিজুসিমার সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে যুদ্ধের আরেকটি নির্মম সত্য। বন্দুকের গুলিতে শুধু মানুষ মারা যায় না—ধ্বংস হয়ে যায় মানুষের ভেতরের শান্তিও।
‘বার্মিজ হার্প’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। পরিচালক যুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো বক্তৃতা দেন না। বরং নীরবতা, প্রকৃতি, সংগীত এবং একজন সৈনিকের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে অনুভব করান।
আর সেই অনুভূতিকে সবচেয়ে গভীর করে তোলে সিনেমার সংগীত।
বীণার সুর এখানে নিছক আবহসংগীত নয়; এটি যেন ছবিটির নিজস্ব ভাষা। কোথাও বিষণ্ণ, কোথাও প্রশান্ত, আবার কোথাও এতটাই নির্মল যে যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝেও এক টুকরো মানবিক আলোর দেখা মেলে। ছবির সুর যখন ভেসে আসে, মনে হয় ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও পৃথিবী এখনো কোমল হতে জানে।
কন ইচিকাওয়ার আরও কিছু কাজ দেখলে বোঝা যায়, যুদ্ধ তার সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ‘ফায়ারস অন দ্য প্লেন’-এও যুদ্ধের ভয়াবহতা নির্মমভাবে ফিরে আসে। তবে দুই ছবির মেজাজ একেবারেই আলাদা। ‘ফায়ারস অন দ্য প্লেন’ যেখানে অন্ধকার ও বিভীষিকার দিকে দর্শককে ঠেলে দেয়, ‘বার্মিজ হার্প’ সেখানে ধ্বংসের মধ্যেও আত্মশুদ্ধির সম্ভাবনা খুঁজে নেয়।
এই কারণেই ‘বার্মিজ হার্প’ কেবল একটি যুদ্ধের সিনেমা হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
ছবিটি দেখতে দেখতে মনে পড়ে অস্কার শিন্ডলারের সেই অসহায় কান্না—যেখানে যুদ্ধের মাঝেও একজন মানুষ বুঝতে পারেন, একটি জীবন বাঁচানো কত বড় মানবিক অর্জন। আবার কোথাও যেন শহীদ কাদরীর কবিতার সেই স্বপ্নময় উচ্চারণ এসে মিশে যায় সিনেমাটির দর্শনে—
‘ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটাতার ব্যারিকেড পার হয়ে…’
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মানুষের ভেতরের যুদ্ধ শেষ হয় না। কেউ ফিরে যায় নিজের পুরোনো জীবনে, কেউ আর ফিরতে পারে না। আর কেউ কেউ মিজুসিমার মতো উপলব্ধি করে—মানুষের সবচেয়ে বড় বিজয় অন্যকে পরাজিত করা নয়, নিজের ভেতরের হিংসাকে পরাজিত করা।
‘বার্মিজ হার্প’ তাই যুদ্ধের গল্প বলতে গিয়ে আসলে শান্তির গল্প বলে। মৃত্যু আর ধ্বংসের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একজন মানুষ কীভাবে মানবিকতার কাছে ফিরে আসে, সেই গল্প বলে।
আর সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যেন কোথাও দূরে বীণার সুর বাজতে থাকে।
সেই সুরে যুদ্ধ নেই।
আছে শুধু মানুষের কাছে মানুষের ফিরে আসার আকুলতা।