মুক্তিযুদ্ধের সংকটময় সময়ে বঙ্গবন্ধুর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশ ইনসাইডার্স | ইতিহাস
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকাকালে তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসিকতা মুক্তিযুদ্ধকে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। এর পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনার পর প্রয়োজন দেখা দেয় একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারের।
এই পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তীকালে মুজিবনগর) আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে এই সরকার।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল—
– মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখা।
– প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া।
– আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখা।
– মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ধরে রাখতে কাজ করা।
– বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
একদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং শরণার্থী সংকট মোকাবিলা—সব মিলিয়ে সেই সময়ের দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত কঠিন।
সৈয়দ নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবন
১৯২৫ সালে কিশোরগঞ্জের যশোদল ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
ভাষা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে কাজ করেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে নেতৃত্বের এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে।
স্বাধীনতার পরও থেমে থাকেনি দায়িত্ব
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পরও সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সাল হয়ে আসে এক ভয়াবহ অধ্যায়।
৩ নভেম্বর: কারাগারে নির্মম হত্যাকাণ্ড
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল পরিবর্তিত হয়। সে সময় সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাখা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে।
তাঁরা হলেন—
১. সৈয়দ নজরুল ইসলাম
২. তাজউদ্দীন আহমদ
৩. ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী
৪. এ এইচ এম কামারুজ্জামান
এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে জেলহত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাসে সৈয়দ নজরুল ইসলামের অবস্থান
সৈয়দ নজরুল ইসলাম কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও সংকটকালীন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রতীক।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও রাজনৈতিক আদর্শ, নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।