বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর তাজউদ্দীন আহমদ: স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম
|বাংলাদেশ ইনসাইডার্স।নিজস্ব প্রতিবেদন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহচর ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম, দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা আজও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুরের কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।
১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই দলটির সংগঠক হিসেবে যুক্ত ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা আরও গভীর হয়। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর ছয় দফা আন্দোলনকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনেও তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের সময়ও দলীয় কার্যক্রম সমন্বয়ে সক্রিয় ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনার এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
১০ এপ্রিল গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধকালীন সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, মুক্তিযুদ্ধের সমন্বয় এবং স্বাধীনতার লক্ষ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে সরকার গঠন করলে তাজউদ্দীন আহমদ অর্থমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিগত বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। ১৯৭৪ সালে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হন তাজউদ্দীন আহমদ। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আরও তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে তাঁকেও হত্যা করা হয়। ইতিহাসে দিনটি জেলহত্যা দিবস হিসেবে পরিচিত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। একজন ছিলেন বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রধান নেতা, অন্যজন সংকটময় সময়ে সেই আন্দোলনকে সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় অসামান্য দায়িত্ব পালন করেন।
তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব, অবদান এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিভিন্ন অধ্যায় যথাযথ ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিলের আলোকে মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ, বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস বুঝতে হলে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি তাজউদ্দীন আহমদের অবদানও সমান গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করতে হবে।