অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এক সংগ্রামী অধ্যায়ের স্মরণ
বাংলাদেশ ইনসাইডার্স | রাজনীতি
রাজনীতির উত্তাল রাজপথ থেকে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবরণ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন ‘অগ্নিকন্যা’ বেগম মতিয়া চৌধুরী। তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৬ অক্টোবর। ২০২৪ সালের এই দিনে ৮২ বছর বয়সে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের এই প্রবীণ নেতা।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানো মতিয়া চৌধুরী ছিলেন সাবেক কৃষিমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদের উপনেতা। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ পথচলা, সংগ্রাম ও অবদান নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে।
ছাত্ররাজনীতি থেকে ‘অগ্নিকন্যা’
১৯৪২ সালের ৩০ জুন পিরোজপুরে জন্মগ্রহণ করেন মতিয়া চৌধুরী। ইডেন কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে তাঁর নেতৃত্ব আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসনবিরোধী আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় তাঁর তেজস্বী বক্তৃতা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা তাঁকে ‘অগ্নিকন্যা’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে। ১৯৬৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে উত্থান
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মতিয়া চৌধুরী প্রচার-প্রচারণা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আহতদের সেবাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের নিয়ে যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনের উদ্যোগেও তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
১৯৭৯ সালে ন্যাপ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৬ সালে দলটির কৃষিবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং পরবর্তী সময়ে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জায়গা করে নেন। রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার গ্রেপ্তারও হন তিনি।
কৃষিমন্ত্রী থেকে সংসদের উপনেতা
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং ২০০৯ সালে আবার কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মতিয়া চৌধুরী। পরবর্তী মেয়াদেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। কৃষি খাত নিয়ে কাজের পাশাপাশি জাতীয় সংসদে শেরপুর-২ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন দীর্ঘদিন।
তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের উপনেতা নির্বাচিত হন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতা, দলীয় সাংগঠনিক ভূমিকা এবং কৃষি খাতে নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যে স্মৃতি রেখে গেলেন
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মতিয়া চৌধুরীর পরিচয় ছিল দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, দলীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন প্রবীণ রাজনীতিক হিসেবে। ছাত্ররাজনীতির মঞ্চ থেকে শুরু করে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং সংসদের উপনেতার দায়িত্ব—তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা ছিল কয়েক দশকব্যাপী।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মূল্যায়ন ও মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘অগ্নিকন্যা’ পরিচিতিটি তাঁর অন্যতম স্বতন্ত্র পরিচয় হয়ে রয়েছে। সাধারণ জীবনযাপন ও স্পষ্টভাষী রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও তিনি সহকর্মী ও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত ছিলেন।
দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও শোক
মতিয়া চৌধুরীর প্রয়াণে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর আওয়ামী লীগ শোক প্রকাশ করেছিল। তাঁর মৃত্যুতে দলটির দীর্ঘদিনের একজন জ্যেষ্ঠ নেতার প্রস্থান ঘটে। মৃত্যুর পরদিন মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্বামী, সাংবাদিক বজলুর রহমানের সমাধিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে ফিরে আসছে দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি। ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে যাওয়া এই রাজনীতিকের জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার অংশ হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ ইনসাইডার্সের পক্ষ থেকে প্রয়াত বেগম মতিয়া চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি সমবেদনা।