যেভাবে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ ইনসাইডার্সের যাত্রা
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়, যা দেশের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও জঘন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হঠাৎ পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। বিভিন্ন স্থানে মব, হত্যা, গুম, খুনসহ নানাবিধ অত্যাচার ও নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। এসব ঘটনার অনেকগুলোই যথাযথ তথ্য-প্রমাণসহ মানুষের সামনে তুলে ধরার মতো পর্যাপ্ত উদ্যোগ আমরা দেখতে পাইনি।
অন্যদিকে, আমাদের দৃষ্টিতে, দেশের একটি বড় অংশের সংবাদ ও ঘটনাপ্রবাহ একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছিল। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রচার চললেও তাদের ওপর সংঘটিত সহিংসতা, নির্যাতন কিংবা মাঠপর্যায়ের বাস্তব ঘটনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছিল না।
এই বাস্তবতায় আমরা সিদ্ধান্ত নিই, অন্য কারও অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের হাতের মোবাইল ফোনকেই আমরা গণমাধ্যমের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করব। জনগণের কাছে যতটা সম্ভব দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ফেসবুককে কেন্দ্র করে শুরু হয় বাংলাদেশ ইনসাইডার্সের পথচলা।
শুরুতে ইনসাইডার্সের কাজের পরিধি কতদূর পর্যন্ত যাবে, সেটি আমাদের নির্ধারিত ছিল না। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তুলে ধরা, বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া তথ্য প্রকাশ করা এবং প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। নিজেদের একটি কার্যকর কাজে সম্পৃক্ত রাখার তাগিদ থেকেই ধীরে ধীরে ইনসাইডার্সের কার্যক্রম বিস্তৃত হতে থাকে।
জাতীয় খবর থেকে জেলা পর্যায়ে
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানির বিভিন্ন ঘটনাও জানতে থাকি।
কিন্তু একটি প্ল্যাটফর্মের পক্ষে একসঙ্গে সারাদেশের প্রতিটি এলাকার ঘটনা কাভার করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখনই আমাদের সামনে আসে জেলা ইনসাইডার্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
সেই সময় বাংলাদেশ ইনসাইডার্সের অনুসারী ছিল মাত্র প্রায় ৮০ হাজার। তবুও আমরা সিদ্ধান্ত নিই, প্রতিটি জেলায় কয়েকজন করে দায়িত্বশীল মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করব। তাদের কাজ হবে নিজ নিজ জেলার ঘটনাগুলো দ্রুত সংগ্রহ করা, যাচাই করা এবং আমাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা।
একটি পেজ থেকে একটি নেটওয়ার্ক
যারা আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইনসাইডার্সের সঙ্গে কাজ করতে এগিয়ে আসেন, তাদের শুধু দায়িত্ব দিলেই হতো না; কাজের ধরনও শেখাতে হয়েছে।
কারণ সংবাদ ও তথ্য উপস্থাপন আমাদের কাছে শুধু একটি সাধারণ কাজ নয়, এটি এক ধরনের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিষয়। কীভাবে একটি ঘটনাকে মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলে ধরা যায়, কীভাবে তথ্যের সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরি করা যায়, কীভাবে নিজের কাজের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা যায়, এসব বিষয়কে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি।
আমাদের লক্ষ্য ছিল, মানুষের পাঠযোগ্য ভাষায়, সহজভাবে এবং যতটা সম্ভব তথ্যনির্ভর উপায়ে ঘটনাগুলো তুলে ধরা। এমনভাবে কাজ করা, যাতে একজন সাধারণ মানুষও কোনো ঘটনা পড়লে বা দেখলে সেটি সহজেই বুঝতে পারেন।
এই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্যায়ে কয়েকটি জেলা ইনসাইডার্সের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে দেশের আরও বিভিন্ন জেলায় এই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হতে থাকে।
একসময় একটি ফেসবুক পেজের কার্যক্রম ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কে।
আজ আমাদের সঙ্গে ত্রিশেরও বেশি জেলা ইনসাইডার্স কাজ করছে। সামনে দেশের বাকি জেলাগুলোতেও ইনসাইডার্সের কার্যক্রম বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে উপজেলা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ইনসাইডার্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
এবার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ ইনসাইডার্স
আমাদের যাত্রা শুধু ফেসবুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা কখনোই ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে পেরেছি, একটি পূর্ণাঙ্গ গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের আরও বিস্তৃত করতে হবে।
সেই লক্ষ্যেই এবার বাংলাদেশ ইনসাইডার্স প্রবেশ করছে ওয়েবসাইটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের জগতে।
এই ওয়েবসাইটে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঘটনা সংবাদ আকারে প্রকাশ করা হবে। জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের আমাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের পাশাপাশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোও তুলে ধরা হবে।
আমাদের লক্ষ্য একটাই, দেশের মানুষের দোরগোড়ায় যতটা সম্ভব দ্রুত সত্য, তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পৌঁছে দেওয়া।
একটি মোবাইল ফোন থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি আজ একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। সামনে আরও বড় পরিসরে কাজ করার প্রত্যয় নিয়েই বাংলাদেশ ইনসাইডার্সের এই পথচলা অব্যাহত থাকবে।